https://inews.soumitra.itlab.solutions/

3556

sylhet

ভাষা নিয়ে বাংলাদেশ-কানাডার মধ্যে ভিন্নধর্মী আলোচনা অনুষ্ঠান

প্রকাশিত : ১৯ মার্চ ২০২৩ ১১:৩২ | আপডেট : ৩০ নভেম্বর -০০০১ ০০:০০

WhatsApp Image 2023-03-20 at 18.53.33ভাষার সঠিক বিকাশের মাধ্যমে একটি জাতির কৃষ্টির এবং আত্মপরিচয়ের ভিত্তি গড়ে উঠে  l এ বছর অমর একুশে ফেব্রুয়ারি ও ২৪তম আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রেক্ষপটে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি যৌথভাবে বাংলাদেশ ও কানাডার উন্মুক্ত অনলাইন আলোচনা অনুষ্ঠিত হলো।

আলোচনায় আলোচক ছিলেন অধ্যাপক, চিন্তাবিদ ও কবি হোসাইন কবির, লোক-গবেষক ড. দীপঙ্কর দে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক ড. হানিফ মিয়া, গবেষক ও প্রাবন্ধিক মহসিন বখত, সৌরভ বড়ুয়া, শিক্ষক ও গবেষক রাহিম সৈকত, প্রেরণা টিভির প্রধান নির্বাহী এডওয়ার্ড প্রবীর মন্ডল এবং ফারজানা নাজ শম্পা l

অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের গ্লোবাল ক্যাম্পেইনার সৌরভ বড়ুয়া ও প্রেরণা টিভির প্রধান নির্বাহী এডওয়ার্ড প্রবীর মন্ডল। এডওয়ার্ড প্রবীর মন্ডল আনুষ্ঠানিকভাবে সবাইকে পরিচয় করিয়ে দিলে সৌরভ বড়ুয়া প্রথমেই আলোচক শিক্ষাবিদ ও শিল্পী হানিফ মিয়াকে আলোচনার জন্য অনুরোধ করেন।

ড. হানিফ মিয়া তাঁর উপস্থাপনায় নিজেকে চেনার তাগিদের আদর্শনির্ভর একটি লালন সংগীত পরিবেশনা করেন এবং বাউল সংগীতের ভাষার সাথে বৃহত্তর মানবিক কৃষ্টির গভীর সংযোগের দিক ব্যক্ত করেন। বাউল সংগীতকে আমাদের বৃহত্তর লোক সংস্কৃতির বৈচিত্রকে বোঝার অপরিহার্য অংশ রূপে অভিহিত করেন তিনি। তিনি মানিকগঞ্জের লোকশিল্পী ভবা পাগলার গানের ভাষার মাধ্যমে আধ্যাত্মবাদের আদর্শ এবং বৃহত্তর বাংলার গণমানুষের প্রেম-বিরহ নিয়ে আলোকপাত করেন। 

সৌরভ বড়ুয়া বলেন, ভাষা ও ভাষার স্বাতন্ত্রময়তাকে সঠিকভাবে সংরক্ষণের অভাবে আমাদের আত্মপরিচয়ের সংকট সৃষ্টি হবে এবং এ সংকট প্রবাসীদের মধ্যে বেশি মাত্রায়ই সৃষ্টি হবে বলে তিনি মনে করেন। তিনি প্যারিসের একটি আন্তৰ্জাতিক সম্মলনের সূত্র ধরে জানান, সারা পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষা, লোক ভাষা যে আগ্রাসনের শিকার হচ্ছে এবং স্যাটেলাইট টিভি ও প্রযুক্তির চাপ আমাদের একটি ভাষার অধীন করার অপচেষ্টা করা হচ্ছে। অমর একুশের ভাষা সৈনিকের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতির জন্য কানাডার ভ্যাঙ্কুভার থেকে উদ্যোগের  বিষয়টি উত্থাপন করেন l

গবেষক ও চিন্তাবিদ মহসিন বখত বাংলা ভাষার বিকাশ প্রসঙ্গে হরিকেল জনপদের কথা উল্লেখ করে প্রত্ন মাগধী আর সংষ্কৃতের সংমিশ্রনে বাংলার উম্ভবের দিক তুলে ধরেন। তাঁর মতে বাংলায় ভাষায় লোক বা আঞ্চলিক ভাষার সমন্বয়ে বারো লাখ যে সমৃদ্ধ শব্দভাণ্ডার, সে তুলনায় ইংরেজি শব্দভাণ্ডার দুই লাখ। তিনি বলেন, ঢাকা এবং কলকাতায় প্রচলিত বাংলা থেকে বাংলাকে চেনা সম্পূর্ণ হয় না। বাংলা ভাষা নোয়াখালী, বরিশাল, খুলনা,  সিলেটি, বগুড়া, রংপুর আর বিভিন্ন অঞ্চলের স্বাতন্ত্রময় উচ্চারণের রীতি, শব্দ, ভাষার এক বিশাল ভাণ্ডার। তিনি বলেন, বাংলায় আরাকানি এবং অহমিয়াসহ বিভিন্ন ভাষার প্রভাব আছেl

সৌরভ বড়ুয়া 'ভাষার আদি অন্ত' শিরোনামে গবেষক মহসিন বখতের লেখা বিষয়ক আলোচনায় নাগরী হরফের কথা উল্লেখ করেন। সেই প্রসঙ্গে আলোচক শিক্ষাবিদ অধ্যাপক হোসেন কবির জানান, নাগরী লিপি ১৪০টি পুথি আছে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে l ময়মনসিংহসহ সিলেট অঞ্চলের বৃহত্তর সাধারণ জনগোষ্ঠী নাগরী হরফে ব্যবহারের কথা মহসিন বখত তাঁর বক্তব্যে সংযুক্ত করেন। সৌরভ বড়ুয়া চট্টগ্রামের বহুল জনপ্রিয় লোকশিল্পী শ্যাম সুন্দর বৈষ্ণব ও শেফালী ঘোষের গান উল্লেখ করে চট্টগামের লোকজ বা আঞ্চলিক ধারার উচ্চারণগত স্বাতন্ত্রময়তার সৌন্দর্যর দিক তুলে ধরেন l

লোক গবেষক ড. দীপংকর দে'র মতে, নদীমাতৃক দেশের ভাটিয়ালি গান কর্মমুখর জীবনের প্রতিচ্ছবি। সারি গান ও দুঃখ সুখনির্ভর বিচ্ছেদি গান বৃহত্তর লোকমানুষের ভাষার সাথে আত্মিক সম্পর্কের আবহে সুন্দরভাবে প্রতিফলিত  হয় l তিনি তাঁর গবেষণা অভিজ্ঞতা থেকে আরও জানান, চট্টগামের বৃহত্তর লোকভাষা প্রায় ৩৭ টি বিশ্বের ভাষার শব্দকে আত্মস্থ করেছে l

অধ্যাপক হোসাইন কবির বলেন, লোকমানুষের ভাষার মূল রূপ বলবৎ রাখতে হবে। তিনি বলন, পৃথিবীতে সাত হাজারের বেশি ভাষা আছে l তবে সঠিকভাবে সংরক্ষণের অভাবে তা হারিয়ে যাচ্ছেl তিনি দুঃখ প্রকাশ করে জানান, চট্টগামের একটি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মাত্র ছয়জন লোক একটি নির্দিষ্ট ভাষায় কথা বলেন। তাঁদের মৃত্যুর সাথে সাথে সেই ভাষা হারিয়ে যাবে। নোয়াখালী, সিলেট, বরিশালের নিজস্ব উচ্চারণ ভঙ্গিতে উচ্চারণ করেন। তাঁর মতে, ভাষার মূল স্থান বা লোকেশনের প্রতি সম্মানের বজায় রাখা উচিত আর উচ্চারণগত পার্থক্যের জন্য কাউকে অবমাননা দৃষ্টিতে বিচার উচিত নয়। এ প্রসঙ্গে তিনি চিন্তাবিদ নুরুল ইসলাম, আহমেদ ছফা বিভিন্ন চিন্তাবিদদের আঞ্চলিক রীতিতে কথোপকোথেনের বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তুলে ধরেন। আলোচক রহিম সৈকত দক্ষিণ চট্রগাম  বাঁশখালী অঞ্চলে ভাষার  বৈচিত্রময়তার কথা তুলে ধরেন। এডওয়ার্ড প্রবীর মন্ডল তাঁর বক্তব্যে বৃহত্তর গণমানুষের ভাষা সংরক্ষণের দিকটি প্রাধান্য দেন।